ইসলামিক২৪.কম

ইসলামিক২৪.কম

হাদীসের আলোকে হযরত মাহদী

  • পোস্টটি প্রকাশিত হয়েছে - 5 September, 2020, Saturday
  • 132 বার দেখা হয়েছে
  •  

    মাওলানা সুহাইব।।

    শেষ যুগে কেয়ামতের আলামত স্বরূপ ঘটবে এমন কিছু ঘটনা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে আগাম জানিয়ে দিয়েছেন। যেহেতু এসব ভবিষ্যদ্বাণী ‘দালাইলুন নাবুওয়্যাহ’ তথা তাঁর নবী হবার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ বহন করে তাই এর প্রতি ঈমান আনয়ন নবীর রিসালাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

    কেয়ামতের বড় বড় আলামতগুলোর সূচনা ঘটবে শেষ যুগে হযরত মাহদীর আগমনের মধ্য দিয়ে। মাহদীর আবির্ভাব এমন বিষয়, যা অনেক সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত এবং উম্মতের ‘তালাক্কি বিল কবুল’ (সর্বযুগে সর্বজন স্বীকৃত বিষয়) দ্বারা সুপ্রতিষ্ঠিত। এ বিষয়ে সহীহ-হাসান ও নির্ভরযোগ্য পর্যায়ের এত বেশি হাদীস রয়েছে যে, অনেক আলিম একে ‘মুতাওয়াতির’ বলেছেন। হাদীসের প্রায় সব কিতাবে মাহদী সম্পর্কে স্বতন্ত্র অধ্যায় রয়েছে।

    অতএব মাহদীর আবির্ভাব একটি অকাট্য বিষয়, যার সংবাদ স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বহু হাদীসে দিয়েছেন। রাসূলের রিসালাতের প্রতি ঈমানের মৌলিক দাবি পূরণের উদ্দেশ্যে মাহদীর আবির্ভাবের ন্যায় অকাট্য বিষয়কে বিশ্বাস করা একজন মুমিনের জন্য অতিব জরুরি।

    বর্তমানে কিছু মানুষ এক্ষেত্রে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। কেউ সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে নিজেই মাহদী দাবি করে বসেছেন। কেউ আধুনিক বিজ্ঞানের নামে মাহদীর মনগড়া ব্যাখ্যা পেশ করছেন। অথচ হাদীসে হযরত মাহদীর পরিচয় ও তার আগমন সংশ্লিষ্ট বহু মৌলিক ও খুটিনাটি বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে।

    বক্ষমান আলোচনায় সংক্ষেপে হাদীসের আলোকে হযরত মাহদীর পরিচয় ও বিবরণ তুলে ধরা হলো।

    মাহদী বিষয়ে নির্ভরযোগ্য হাদীসে যেসব তথ্য এসেছে তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ-

    ১. হযরত মাহদী কিয়ামতের পূর্বে অবশ্যই আসবেন। -তিরমিযী ২২৩০, আবু দাউদ ৪২৮১, সহীহ ইবনে হিব্বান ৬৭৮৪

    ২. তার নাম হবে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নামানুসারে এবং পিতার নাম হবে নবীজীর পিতার নামে, অর্থাৎ তিনি হবেন মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ। -আবু দাউদ ৪২৮১, তিরমিযী ২২৩০

    ৩. বহু হাদীসে তাকে মাহদী বলে অভিহিত করা হয়েছে। এটি হবে তার উপাধি। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৯, মুসনাদে আহমাদ ৬৪৫, ১১৩৪৪, ১১৫০২, ১১১৬৩, তিরমিযী ২২৩২, আবু দাউদ ৪২৮৪,

    ৪. তিনি হবেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর বংশধর, তথা আহলে বাইত এর সদস্য। – মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৯, মুসনাদে আহমাদ ৬৪৫, আবু দাউদ ৪২৮৪, ইবনে মাজাহ ৪০৮৫
    একটি বর্ণনায় আছে, মাহদী হযরত ফাতেমা রা. থেকে নবীজির বংশধর হবেন।-আবু দাউদ ৪২৮৪, ইবনে মাজাহ ৪০৮৬
    (সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হযরত আলি রাযি এর ‘আসার’ (বক্তব্য) থেকে আরো জানা যায় যে তিনি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদরের দৌহিত্র হযরত হাসান রা. এর বংশের হবেন। – আবু দাউদ ৪২৯০)

    ৫. তার কপাল হবে প্রশস্ত, নাক সরু ও লম্বা।-আবু দাউদ ৪২৮৪, মুস্তাদরাকে হাকেম ৪/৫৫৭, হাদীস ৮৬৭০

    ৬. তার পূর্বে গোটা পৃথিবী জুলুম-অন্যায়ের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে।-মুসনাদে আহমাদ ১১৩১৩, ১১২২৩, মুসনাদে আবি ইয়ালা ৯৮৭, সহীহ ইবনে হিব্বান ৬৭৮৪

    ৭. এক রাতের ভেতর আল্লাহ তায়ালা তাকে খেলাফতের গুরুভার বহনের উপযুক্ত করে দিবেন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৯, মুসনাদে আহমাদ ৬৪৫, ইবনে মাজাহ ৪০৮৫

    ৮. মাহদীর আত্মপ্রকাশের প্রেক্ষাপট হবে এমন- একজন খলিফার মৃত্যুর সময় নতুন খলিফা নির্বাচন প্রসঙ্গে লোকদের মাঝে মতবিরোধ দেখা দিবে। তখন মদীনা থেকে এক ব্যক্তি (মাহদী) পালিয়ে মক্কায় চলে আসবে। মক্কার কতিপয় লোক তাকে দেখে তার কাছে আসবে এবং হাজারে আসওয়াদ ও মাকামে ইবরাহীমির মাঝে জোরপূর্বক তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করবে।-মুসনাদে আহমাদ ২৬৬৮৯, আবু দাউদ, মাহদী অধ্যায়, হাদীস ৪২৮৬, সহীহ ইবনে হিব্বান ৬৭৫৭

    ৯. বাইয়াতের খবর পেয়ে শামের একদল তার বিরুদ্ধে বাহিনী পাঠাবে, তারা যখন মক্কা ও মদীনার মধ্যবর্তী বাইদা নামক স্থানে পৌঁছবে তখন তাদেরকে সদলবলে ভূমিতে ধ্বসিয়ে দেয়া হবে। এ আশ্চর্য ঘটনা জানতে পেরে শামের আবদালগণ ও ইরাকের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের এক জামাত তার হাতে বাইয়াত গ্রহণ করবেন। -ঐ

    ১০.তারপর এক কুরাইশী, কালব গোত্র যার নানার গোষ্ঠী হবে, তার (বাইয়াতকৃত খলিফার) বিরুদ্ধে সৈন্যদল পাঠাবে। এ যুদ্ধে মাহদী ও তার দলের হাতে ‘কালব বাহিনী’ পরাজিত হবে। যুদ্ধ জয়ের পর মাহদী গণীমতের মাল সকলের মাঝে বণ্টন করে দিবেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাহ মোতাবেক সবকাজ আঞ্জাম দিবেন। সে সময় ইসলাম গোটা পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে।-ঐ

    ১১. তিনি মুসলমানদের খলিফা হবেন।-সহীহ মুসলিম, ৭৫০১, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৫
    এছাড়াও কোনো কোনো হাদীসে তাকে মুসলমানদের ইমাম শব্দে ভূষিত করা হয়েছে। হাদীসে উল্লেখিত ‘ইমাম’ শব্দের অর্থ হলো, ‘আমীর ও খলিফা’। সহীহ মুসলিমে জাবের রা থেকে বর্ণিত হাদীসে ‘উমারা’ (আমীর এর বহুবচন) শব্দ আছে এবং সুনানে ইবনে মাজাহ-এ নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত হাদীসে আছে, ‘তাদের ইমাম হবেন নেককার ব্যক্তি’। এ সব থেকে ইমাম শব্দ দ্বারা আমীর ও খলিফা হবার বিষয়টিই সাব্যস্ত হয়।
    তবে বিভিন্ন হাদীস থেকে একথাও জানা যায় যে, ঈসা আলাইহিস সালামের নুযূলের পর মাহদী ফযরের নামাযে ইমামতিও করবেন।-সহীহ বুখারী ৩৪৪৯, সহীহ মুসলিম ৪০৯, ৪১২, মুসনাদে আহমাদ ১৪৯৫৪, সহীহ ইবনে হিব্বান, ৬৮১৯

    ১২. তার সুশাসনের ফলে সমগ্র দুনিয়া আদল-ইনসাফে ভরে যাবে।-তিরমিযী ২২৩০, আবু দাউদ ৪২৮১, সহীহ ইবনে হিব্বান ৬৮২৪

    ১৩. তার খেলাফতকাল কমপক্ষে সাত বছর হবে। -আবু দাউদ ৪২৮৪, মুস্তাদরাকে হাকেম ৪/৫৫৭, হাদীস ৮৬৭০

    ১৪. তার আমলে আসমান থেকে মুষলধারে (পরিমিত পরিমাণে) বৃষ্টি বর্ষিত হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৩, মুসনাদে আহমাদ ১১২১২, মুস্তাদরাকে হাকেম ৪/৫৫৭,৫৫৮, হাদীস ৮৬৭৩

    ১৫. প্রচুর পরিমাণে ফসল উৎপাদিত হবে।-মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৩, মুসনাদে আহমাদ ১১২১২

    ১৬. গবাদিপশুর সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে।-মুস্তাদরাকে হাকেম ৪/৫৫৭,৫৫৮, হাদীস ৮৬৭৩

    ১৭. মুসলিম উম্মাহ এত সুখ-শান্তিতে বসবাস করবে যা ইতিপূর্বে কখনো দেখা যায়নি।-মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৩, মুসনাদে আহমাদ ১১২১২

    ১৮. সম্পদের প্রাচুর্য এত বেশি হবে যে তিনি অকাতরে বিলিয়ে দেবেন, গুণে হিসাব করে দেয়ার প্রয়োজনবোধ করবেন না।-সহীহ মুসলিম ৭৫০২, মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা ৩৮৭৯৫, মুসনাদে আহমদ ১১৩৪৪,১১৫০২

    ১৯. একদিন ফযরের নামাযের সময় হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম আসমান থেকে নেমে আসবেন। এ দৃশ্য দেখে মাহদী ইমামের জায়গা থেকে পিছনে সরে এসে তাঁকে নামায পড়ানোর জন্য অনুরোধ করবেন। তখন হযরত ঈসা আলাইহিস সালাম বলবেন, তোমরা একে অপরের ইমাম, কারণ আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বিশেষ সম্মানে ভূষীত করেছেন। তারপর তিনি মাহদীর পিছনে নামায আদায় করবেন।-সহীহ বুখারী ৩৪৪৯, সহীহ মুসলিম, ৪১২, সহীহ ইবনে হিব্বান, ৬৮১৯, সুনানে ইবনে মাজাহ ১০৭৭, আবু দাউদ ৪৩২৪।
    এ থেকে বোঝা যায় যে, দাজ্জালের আবির্ভাবও মাহদীর সময়ে হবে, কারণ হযরত ঈসা আলাহিস সালাম দাজ্জালকে হত্যা করার জন্য আসবেন।

    লেখক: শিক্ষক ও খতীব

    
    এই পোস্টে কোন মন্তব্য নেই!

    একটি মন্তব্য করুন


    অ্যাকাউন্ট প্যানেল

    আমাকে মনে রাখুন

    সকল বিভাগ