ইসলামিক২৪.কম

ইসলামিক২৪.কম

করোনা ভাইরাস : ঘরে জুমু‘আর বিষয়ে দেওবন্দের তাফসিলী ফতওয়া

  • পোস্টটি প্রকাশিত হয়েছে - ৯ এপ্রিল, ২০২০, বৃহস্পতিবার
  • 889 বার দেখা হয়েছে
  • করোনার পরিস্থিতিতে জুমু‘আ আদায়ে দারুল উলূম দেওবন্দের
    পরিবর্তিত তাফসিলী ফাতওয়ার আলোকে মাসআলার সমাধান

    মুফতী আবুল হাসান শামসাবাদী

    ইতোপূর্বে দেওবন্দের ‍মুহতামিম মুফতী আবুল কাসিম নুমানী সাহেবের পক্ষ থেকে করোনা ভাইরাসের বর্তমান পরিস্থিতিতে যে ফাতওয়া প্রকাশিত হয়েছে, মুফতীয়ানে দেওবন্দের ঐক্যবদ্ধ ফাতওয়ায় সে ব্যাপারে কিছু পরিবর্তন বা সংশোধনী আনা হয়েছে। সেই আলোকে দারুল উলূম দেওবন্দের মুফতীয়ানে কিরামের ৬ শা‘বান-১৪৪১ হিজরী প্রকাশিত তাফসিলী ফাতওয়ার ভিত্তিতে এ পরিস্থিতিতে মসজিদসমূহে ও ঘরে জুমু‘আর নামায আদায়ের বিষয়ে নিম্নবর্ণিত সমাধান পেশ করা হচ্ছে–

    মাসআলা – ১

    ➊ যে শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রামে জুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্ত পাওয়া যায় এবং সেই ভিত্তিতে সেখানে পূর্ব থেকেই যে সকল মসজিদে জুমু‘আর নামায কায়েম হয়ে আসছে, সেখানে সরকারের বেঁধে দেয়া নিয়ম অনুযায়ী, অনুর্দ্ধ ১০ জন লোক যথারীতি জুমু‘আর নামায আদায় করবেন।

    মাসআলা–২

    ➋ যে শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রামে জুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্ত পাওয়া যায়, সেখানে যদি কোন পাঞ্জেগানা মসজিদ থাকে–যেখানে পূর্বে জুমু‘আ পড়া হতো না, বর্তমান অবস্থায় পরিস্থিতি ‍স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সেই এলাকার পাঞ্জেগানা ওয়াক্তী মসজিদে অনুর্দ্ধ ১০জন মুসল্লী নিয়ে জুমু‘আর নামায কায়েম করবেন। তাহলে এর দ্বারা আরো কিছু মুসল্লীর জুমু‘আর নামায আদায়ের সুযোগ হবে।

     

    উল্লিখিত পরিস্থিতিতে ইযনে ‘আম সম্পর্কে সন্দেহের নিরসন :

    বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে মসজিদে ১০জন মুসল্লীর অতিরিক্ত কাউকে মসজিদে ঢুকতে না দেয়ার কারণে ইযনে ‘আম-এর মধ্যে সমস্যা হবে না। কেননা, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মসজিদসমূহের মধ্যে জুমু‘আর নামাযে ১০জন মুসল্লীর বেশী কাউকে মসজিদে ঢুকতে যে নিষেধ করা হচ্ছে, এটা পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে জনস্বার্থে নেয়া সরকারী পদক্ষেপ হিসেবে করা হচ্ছে। তাই এটা জুমু‘আ সহীহ হওয়ার জন্য ইজনে ‘আম শর্তের প্রতিবন্ধক হিসেবে বিবেচিত হবে না। কারণ, এর ‍উদ্দেশ্য মানুষকে জুমু‘আ থেকে বাধা দেয়া নয়, বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে– নিয়ম ভঙ্গের ফলে আরোপিত অসুবিধা থেকে রক্ষা পাওয়া।

    এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে বলা হয়েছে–
    اما اذا كان لمنع عدو يخشي دخوله وهو في الصلاة فالظاهر وجوب الغلق –
    “কিন্তু যদি জুমু‘আর নামাযে আসতে বাধা দেয়া কোন শত্রুর কারণে হয়–নামায পড়া অবস্থায় যার প্রবেশের আশংকা হয়, তখন অনায়াসেই গেট লক করার হুকুম দেয়া আবশ্যক হবে।”

    (দ্রষ্টব্য : হালাবী [হাশিয়াতুত তাহতাভী আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড, ৩৪৪ পৃষ্ঠা])

    তেমনি অপর কিতাবে এ সংক্রান্ত ফাতওয়ার ব্যাখ্যায় রয়েছে–
    قوله ”لم تنعقد“ يحمل علي ما اذا منع الناس لا ما اذا كان لمنع عدو او لقديم عادة وقد مر
    “তার কথা : ‘ইযনে ‘আম না থাকলে জুমু‘আ সহীহ হবে না’ এটা ঐ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যখন মানুষকে জুমু‘আয় শরীক হতে বাধা দেয়া হবে। কিন্তু যদি শত্রুকে বাধাগ্রস্ত করতে অথবা সেখানকার নিরাপত্তার পূর্বনিয়ম হিসেবে সেখানে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়, তা জুমু‘আ কায়েমে প্রতিবন্ধক হবে না। এ সম্পর্কে পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে।”

    (দ্রষ্টব্য : হালাবী [হাশিয়াহ : আত-তাহতাবী আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড, ৩৪৪ পৃষ্ঠা])

    অনুরূপভাবে ইমদাদুল ফাতাওয়া কিতাবে রয়েছে–
    اذن عام ہونا بهي منجمله شرائط صحت جمعه ہے – جس کے معني یہ ہیں کہ خود نماز پڑھنے والے كو روكنا وہان مقصود نہ ہو – باقي اگر روک ٹوک كسي اور ضرورت سے ہو وه اذن عام مين مخل نہیں –
    “ইযনে ‘আম বিদ্যমান থাকাও জুুমু‘আ সহীহ হওয়ার শর্তাবলির অন্তর্ভুক্ত। যার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো–স্বয়ং নামায আদায়কারীগণকে যেন বাধা দেয়া সেখানে উদ্দেশ্য না হয়। তবে যদি অন্য কোন প্রয়োজনে বাধা দেয়া হয়, তা ইযনে আম-এর মধ্যে বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী গণ্য হবে না।”

    (দ্রষ্টব্য : ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১ম খণ্ড, ২১৪ পৃষ্ঠা])

    তেমনি ইমদাদুল আহকাম কিতাবে বলা হয়েছে–
    اگر چھاؤنی يا قلعہ ميں جمعہ ادا كيا جائے تو جائز ہے – گو چھاؤنی اور قلعہ ميں دوسرے لوگ نہ آ سكتے ہو – كيوں کہ مقصود نماز سے روكنا نہیں ہے , بلكه انتظام مقصود ہے –
    “যদি সেনা ছাউনি বা কিল্লার মধ্যে জুমু‘আ আদায় করা হয়, তাহলে তা জায়িয হবে। যদিও সেনা ছাউনি ও কিল্লায় অন্য লোকজন আসতে পারেন না। কেননা, সেখানে তাদেরকে প্রবেশ করতে না দেয়া নামায থেকে বাধা দেয়ার জন্য নয়, বরং তাতে নিরাপত্তার ব্যবস্থা উদ্দেশ্য।”

    (দ্রষ্টব্য : ইমদাদুল আহকাম, ১ম খণ্ড, ৭৫২ পৃষ্ঠা)
    .

    মাসআলা–৩

    ➌ শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রাম-এলাকার যে সকল লোক মসজিদে জুমু‘আ আদায় করতে না পারেন, তাদের নিজেদের বাড়ীর বৈঠকখানায় বা ড্রইংরুমে যদি নামাযের ব্যবস্থা করা যায়, আর সেই এলাকার পরিস্থিতি যদি বেশী নাজুক না হয় অর্থাৎ প্রশাসনের পক্ষ থেকে কয়েকজনের একত্রিত হতে বাধা না থাকে, সেই সাথে ইযনে ‘আম-এর সাথে জুমু‘আর ইন্তিজাম করা সম্ভব হয় অর্থাৎ আশপাশের লোকজনকে জুমু‘আর জন্য জানানো হয় যে, যারা ইচ্ছুক তারা শরীক হতে পারেন, এরপর সরকারী নিয়ম হিসেবে জুমু‘আর জন্য সর্বসাকুল্যে অনুর্দ্ধ ১০ জনকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়, সেই অবস্থায় তারা মিলে সেখানে জুমু‘আর নামায আদায় করে নিবেন।

    স্মার্তব্য যে, যে সকল অবস্থায় ‍জুমু‘আর নামায পড়ার কথা বলা হয়েছে, সেক্ষেত্রে জুমু‘আর জন্য ইমাম সাহেব ছাড়াও আরো অন্তত তিনজন মুসল্লী থাকা আবশ্যক। কিন্তু যদি মুসল্লী এর চেয়ে কম হয়, তাহলে জুমু‘আ পড়া সহীহ হবে না। তখন ইনফিরাদীভাবে জোহরের নামায পড়ে নিতে হবে।

    মাসআলা–৪

    ➍ যারা উল্লিখিত অবস্থায় সেভাবে (ইযনে ‘আম-এর সাথে বৈঠকখানায়) জুমু‘আ কায়েম করতে না পারেন প্রশাসনের বাধার কারণে কিংবা পরিস্থিতির আরো অবনতি হওয়ায় লোকজনের একত্র হওয়া সম্ভব না হওয়ার কারণে অথবা পরিস্থিতির ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে কেউ জুমু‘আর জন্য যেতে পারছেন না, অথবা ইমাম ব্যতীত আরো তিনজন ‍মুসল্লী না থাকায়, কিংবা যারা আছেন, তাদের মধ্যে কেউ ইমাম হয়ে খুৎবাহ-নামায ইত্যাদি সম্পন্ন করার মতো যোগ্যতা না থাকার কারণে, এমতাবস্থায় তারা শরীয়তের দৃষ্টিতে মা‘জূর বলে গণ্য হবেন। তাই তাদের জন্য যার যার ঘরে ইনফিরাদীভাবে (জামা‘আত না করে) জোহরের নামায পড়া কর্তব্য হবে।

    উল্লেখ্য, সেই অবস্থায় তারা (জুুমু‘আর পরিবর্তে) জোহরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করতে পারবেন না। অন্যথায় তা মাকরূহ হবে। কেননা, শহর বা উপশহর কিংবা বড় গ্রাম-এলাকায় যেখানে জুুমু‘আ ফরজ, সেখানে যখন জুমু‘আর ব্যবস্থা থাকবে তা এক স্থানে হোক বা কয়েক স্থানে এবং তার ছোট জামা‘আত হোক বা বড় জামা‘আত, কোন অবস্থায়ই সেখানে কোন ‍উজরের কারণে যারা জুমু‘আর নামায পড়তে পারেননি, তাদের জন্য জোহরের নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহে তাহরীমী হবে। এটাই সঠিক দলীলভিত্তিক ফাতওয়া। এমতাবস্থায় যারা জামা‘আতের সাথে জোহরের নামায পড়ার অবকাশের কথা বলেন, তাদের কথা জুমহুরের মতের খিলাফ। এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে রয়েছে–
    قوله ”وصورة المعارضة“ لان شعار المسلمين في هذا اليوم صلاة الجمعة – وقصد المعارضة لهم يؤدي الي امر عظيم – فكان في صورتها كراهة التحريم –
    “তার বক্তব্য : ‘তখন জোহরের জামা‘আত দ্বারা জুুমু‘আর সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সূরত হয়, যা মাকরূহ।’ কেননা, জুমু‘আর দিন ‍মুসলমানদের নিদর্শন হচ্ছে জুমু‘আর নামায। আর এ সময় তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক বড় বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তাই তখন জোহরের জামা‘আতের ব্যবস্থা মাকরূহে তাহরীমী হবে।”

    (দ্রষ্টব্য : রদ্দুল মুহতার-কিতাবুস সালাহ-বাবুল জুমু‘আ, ৩য় খণ্ড, ৩৩ পৃষ্ঠা)

    তেমনি ইমাম সারাখসীর আল-মাবসূত কিতাবে বলা হয়েছে–
    لان المأمور به في حق من يسكن المصر في هذا الوقت شيئان ترك الجماعة و شهود الجمعة واصحاب السجن قدروا علي احدهما وهو ترك الجماعة فيأتون بذلك –
    “জুমু‘আর দিন কয়েদীগণ জুমু‘আ পড়তে না পারলে একাকিভাবে জোহর পড়বেন (জামা‘আত করে নয়)। কেননা, এ সময় যারা শহরে বাস করছেন, তাদের ক্ষেত্রে (অবস্থাভেদে) দু’টি হুকুমের কোন একটি প্রযোজ্য হবে : (ক) (উজরের কারণে) জামা‘আত তরক করা। (খ) জুমু‘আর নামাযে উপস্থিত হওয়া। আর কয়েদীগণ এতদুভয়ের একটি করতে সক্ষম হচ্ছেন, তা হলো জামা‘আত তরক করা। সুতরাং তারা সেটাই করবেন।”

    (দ্রষ্টব্য : আল-মাবসূত লিস-সারাখসী, বাবু সালাতিল জুমু‘আহ, ২য় খণ্ড, ৩৯ পৃষ্ঠা)

    মাসআলা–৫

    ➎ যে ছোট গ্রামে জুুমু‘আ আদায়ের শর্ত পাওয়া যায় না, সেখানকার বাসিন্দাগণ অনান্য দিনের মতো জুমু‘আর দিনেও মসজিদে (অনুর্দ্ধ ৫জন) অথবা নিজেদের ঘরে ৫জন মিলে জোহরের নামায জামা‘আতের সাথে আদায় করবেন। তাদের জন্য জোহরের নামায একাকি পড়ার আবশ্যকতা নেই। এ সম্পর্কে ফাতওয়ার কিতাবে রয়েছে–
    ومن لم تجب عليهم الجمعة من اهل القري والبوادي لهم ان يصلوا الظهر بجماعة يوم الجمعة باذان واقامة –
    “আর ছোট গ্রাম বা উপত্যকার অধিবাসীগণ যাদের উপর জুমু‘আ ফরজ নয়, তাদের জন্য জুমু‘আর দিন আযান ও ইকামতের সাথে জোহরের নামায জামা‘আত করে আদায় করা সঙ্গত হবে।”

    (দ্রষ্টব্য : ফাতাওয়া তাতারখানিয়া ‘আলা হামিশিল হিনদিয়্যাহ, ১ম খণ্ড, ১৭৭ পৃষ্ঠা)

    তেমনি অপর কিতাবে রয়েছে–
    وقوله ”في مصر“ اما في حق اهل السواد فغير مكروه لانه لا جمعة عليهم –
    “তার বর্ণনা : ‘শহরের মধ্যে জুমু‘আর দিন জোহরের নামায জামা‘আতে পড়া মাকরূহ।’ কিন্তু ছোটগ্রামের অধিবাসীগণের জন্য তা মাকরূহ নয়। কেননা, তাদের উপর ‍জুমু‘আ নেই।”

    (দ্রষ্টব্য : হাশিয়াতুত তাহতাভী ‘আলাদ দুররিল মুখতার, ১ম খণ্ড,৩৪৬ পৃষ্ঠা)

    এভাবে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সকলে নিজ নিজ অবস্থা অনুযায়ী মাসআলা নির্ণয় করে আমল করবেন। এ জন্য প্রয়োজনে স্থানীয় আলেম-মুফতীগণ থেকে পরামর্শ নিতে পরেন। মহান আল্লাহ সকলকে সহীহভাবে দ্বীনের সকল আমল যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

     

    দেওবন্দের ফাতওয়ার ‍মূল কপি→

    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ১ম পাতা
    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ১ম পাতা

     

    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ২য় পাতা--
    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ২য় পাতা–

     

    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ৩য় শেষ পাতা
    দেওবন্দের ফাতওয়ার মূল কপির ৩য় শেষ পাতা

    সূত্র, আদর্শ নারী

    
    এই পোস্টে কোন মন্তব্য নেই!

    একটি মন্তব্য করুন


    অ্যাকাউন্ট প্যানেল

    আমাকে মনে রাখুন

    সকল বিভাগ